ডেস্ক রিপোর্টঃ
১৯৯৭ সালে ২-রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী জেএসএস এর সামরিক শাখা শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তিচুক্তি করে তৎকালীন আওয়ামিলীগ সকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চুক্তির ৭২ টি ধারা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা থাকলেও পাহাড়ে বসবাস করা পাহাড়ি ও বাঙালিদের দাবি চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বাধা ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের সন্ত্রাসী ক্যাম্পগুলো। অনেকেই মনে করেন চুক্তি হয়েছিল ভারতের ইশারায়, আবার চুক্তির পথে বাধাও ভারত। যায় হোক এবার আসুন বোঝার চেষ্টা করি ভারত কিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির পথে বাধাঁ।
১৯৯৭ সালের চুক্তির আগে জেএসএস এর সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল এবং সেখান থেকে অভিযান পরিচালনা করত এমন অভিযোগ রয়েছে। শুরু থেকেই শান্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করছে ভারত এবং এর যথেষ্ট প্রমাণও আছে বাংলাদেশের হাতে। মূলত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রেখে ভারত এই অঞ্চলটিকে নিজেদের আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে বহু আগে থেকে। জেএসএস ও ইউপিডিএফ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলোর উপর চোরাগুপ্ত আক্রমণ চালিয়ে পালিয়ে যায় ভারতে। ভারতও তাদের আশ্রয় দিয়েছে শুরু প্রথম থেকে। শান্তিচুক্তির আগে থেকে আজ অব্দি ভারতের শেল্টার চলমান রয়েছে। ভারতের অরুণাচল, মেঘালয়, ত্রিপুরাতে এখনো রয়েছে শান্তিবাহিনীর বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষন ক্যাম্প। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার বিএসএফ ও ভারত সরকারকে এই বিষয়ে অবগত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশে ভারত সীমান্তের ভিতরেও ৬টি এলাকাভিত্তিক জনগোষ্ঠী এন্সার্জেন্সী যুদ্ধে ব্যস্ত। সেগুলো হলো: নাগাল্যান্ড ও মনিপুরে নাগা
এন্সার্জেন্সী, মূল আসামে উলফা এন্সার্জেন্সী, ইম্ফল উপত্যকায় মেইতি এন্সার্জেন্সী, মেঘালয়ে এইচ এ এল এন্সার্জেন্সী এবং ত্রিপুরায় এনএলএফ এন্সার্জেন্সী। এছাড়াও মনিপুর ও মিজোরামে আরোও আছে কেএনএফ এন্সার্জেন্সী।
এবার আসুন জেনে নিই, ভারত কোন সময় কিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইন্সার্জেন্ট’র (জেএসএস, ইউপিডিএফ) এর হাতে অস্ত্র ও প্রশিক্ষন দিয়েছে।
ঘটনা-১ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার দুমাস পরেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র, তাদের বিশেষ দূত গোপাল কৃষ্ণ চাকমার (আসল কিংবা ছদ্মনাম) মারফত, মানবেন্দ্র লারমাকে আগরতলায় ডেকে পাঠান। সেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় নেতার সাথে মানবেন্দ্র লারমার কথাবার্তা হয়। এ সময় লারমা পার্টির মূল আদর্শ কম্যুনিজমকে গোপন রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করার জন্য ভারতের কাছে আবেদন জানান। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ লারমাকে সহযোগিতার আশ্বাসও দিলেন।
ঘটনা-২: ১৯৭৫ সালে শান্তিবাহিনীর ২১ সদস্যের ভারতের দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নেয়। এই দলটি উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণসহ অস্ত্র পরিচালনা প্রশিক্ষণ, বেতার যন্ত্র পরিচালনা ইত্যাদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
ঘটনা- ৩: ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝিতে ভারত থেকে অস্ত্রের প্রথম চালান আসে পার্বত্য চট্টগ্রামে। চালান রিসিভ করেন শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষক মেজর অফুরন্ত(ছদ্দনাম নলীন রঞ্জন চাকমা)। এসময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ৬ জন উপস্থিত ছিলেন। উক্ত চালানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৫০ টি ৩০৩ রাইফেল, ১০ হাজার বল এ্যামুনেশন ও ১৫০টি গ্রেনেড দিয়েছিল।
ঘটনা- ৪: ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেজর অফুরন্ত ১৫০ জন সঙ্গীসহ ভারতের ইজারা নামক স্থানে বৈরাগির দোকানের নিকট অস্ত্রের ২য় চালান গ্রহণ করে। এই চালানে ছিল এলএমজি ১২টি, ৩০৩ রাইফেল ১০০টি এবং ২০ হাজার রাউন্ড গুলি।
ঘটনা- ৫: ১৯৭৭ সালের নভেম্বর/ডিসেম্বর এর দিকে আসে আরো কয়েকটি চালান। তন্মধ্যে ছিল এসএমজি (কার্বাইন), সেমি অটো রাইফেল, এসএসজি ৯মি.মি সহ বেশকিছু ওয়ারলেস। সকল অস্ত্র ভারতের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ফোর্সের ৩টন ট্রাকে করে আনা হতো। অস্ত্রের পাশাপাশি ৩০/৪০ হাজার টন ড্রাই রেশনও দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৬ থেকে ২০২৫ অব্দি পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠগুলোকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ভারত।
ঘটনা-৬: ২০২৫ সালের মার্চ/এপ্রিল মাসে ভারতের এমিউনেশন ফ্যাক্টরি খাদকি থেকে ১২.৭×৯৯ ক্যালিবারের বুলেট পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠগুলোকে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনা-৭: ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ভারত থেকে আসা একটি বড় ধরণের অস্ত্রের চালান লুটে নিতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ উভয় খাগড়াছড়িতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে জেএসএস এর ৬ জন ও ইউপিডিএফ এর ৪ জন নিহত হয়।
ঘটনা-৮: ১। ২০২১ সালে ইউপিডিএফ (মূল) এর নেতাকর্মীদের ভারতে অবৈধভাব যাতায়াত এবং অবস্থান সম্পর্কে এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা যায়-
২৬ এপ্রিল ২০২১ তারিখ ১৩:০০ ঘটিকায় আগরতলার বটতলা নামক স্থানে সমীর বনিক এর কাছ থেকে বিপ্লব চাকমা নগদ বিশ লক্ষ বাংলাদেশী টাকা এক্সেস করে। ২৭ এপ্রিল ২০২১ তারিখ বিপ্লব এবং তপন অস্ত্র ক্রয় করার জন্য আগরতলায় অবস্থান করে। গোয়েন্দা বিভাগ, ত্রিপুরা পুলিশ,এএসপি রনজিত দেববর্মন, এসপি দেবাশীষ দাশ, ওসি পরিতাষ জমাটিয়া জেএসএস এর অস্ত্র চোরাচালানের মূল হোতা সমাজ প্রিয় চাকমার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে।
এবার আসুন জেনে নেয়া যাক শান্তিচুক্তির সময় ভারতের মাটিতে শান্তিবাহিনী (জেএসএস)-এর কিছু ক্যাম্পের অবস্থান।
১. শান্তিবাহিনীর মিশন একাডেমী- ভারতের জয়চন্দ্রপাড়া বিএসএফ ক্যাম্প থেকে আনুমানিক দেড় মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।
২. শান্তিবাহিনীর সদর দপ্তর(চিম্বুক)- এসকে পাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের আনুমানিক ৩ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত।
৩. মাইনি মিশন জুম ক্যাম্প- এসকে পাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের আনুমানিক ৩ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত।
৪. উলুছড়ি ক্যাম্প- এসকে পাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের আনুমানিক ২ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত।
৫. জিরানি ক্যাম্প- বোয়ালখালী বিএসএফ ক্যাম্পের আনুমানিক ৩ মাইল দক্ষিন-পূর্বে অবস্থিত। এরকম আরো ৫০ এর অধিক শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ভারতে রয়েছে।
১৯৭৬ সালে ভারত থেকে প্রথম অস্ত্রের চালান আসার পর থেকেই শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও বাঙালিদের উপর গেরিলা আক্রমণ শুরু করে। অবশ্য ১৯৭৬ এর আগেও বেশ কয়েকবার আক্রমণের স্বীকার হয়েছে বাঙালি গ্রাম ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলো। শান্তিবাহিনীর কথামত কাজ না করলে পাহাড়িরাও রক্ষা পায় না তাদের হাত থেকে। অস্ত্রের চালান ঘিরে গড়ে ওঠেছে আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি (৫ অক্টোবর,২০২৫) তারিখে সময় সংবাদে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে “অন্তত চারটি রুট হয়ে অস্ত্র ঢুকছে রাঙ্গামাটিতে। যার একটি, মিয়ানমার থেকে ভারতের মিজোরাম হয়ে সীমান্ত পার হয়ে থানচি, লুলংছড়ি, চাকপতিঘাট, বসন্তপাড়া হয়ে রাঙ্গামাটিতে প্রবেশ। অস্ত্র আসার আরেক পথ- বান্দরবান থেকে বাঙ্গালহালিয়া, রাইখালী বাজার, বড়ইছড়ি হয়ে কাউখালী রুট।” তৃতীয় রুট হচ্ছে- মিয়ানমার থেকে মিজোরাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ, এরপর বরকল, শুকনাচারী, তালুকদারপাড়া, সারোয়াতলী হয়ে বাঘাইছড়ি পৌঁছাচ্ছে অস্ত্র। এছাড়া মিয়ানমার থেকে মিজোরামের পুকজিং, মানপাড়া সীমান্ত পেরিয়ে অস্ত্র যাচ্ছে রাঙ্গামাটির সাজেক লংকর পয়েন্টে।
এসব রুটে বাংলাদেশে অস্ত্র আসার পথে চলতি বছর দেশটিতে ধরা পড়েছে কিছু চালান। জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে জব্দ হয়েছে ৫টি বড় চালান। এসব চালানে ছিল একে-৪৭, এম-১৬, গ্রেনেড, গ্রেনেড লঞ্চারসহ বিভিন্ন ধরনের ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ।অস্ত্রের বড় অংশ আসে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে; এরপর এগুলো ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। মিয়ানমার থেকে ৩ লাখ টাকার অস্ত্র বাংলাদেশে এনে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো ব্যবসাটি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং অস্ত্র আনা-নেয়ার সবকিছু তারা সমন্বয় করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল তৈরি করা জেএসএস এর কথিত জুম্মল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনোগীত জুম্মকে ইতোমধ্যে ভারত আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। সে বর্তমানে ভারতে আছে। এছাড়াও পিসিজেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের অস্ত্র কমান্ডার জ্যোতিষ্মান চাকমা বুলবুল এবং সমাজ প্রিয় চাকমাকে ভারত নাগরিকত্ব প্রদান করে সেই দেশে আশ্রয় দিয়েছে। মূলত তারাই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র সাপ্লাই করছে বর্তমানে। অন্যদিকে মায়ানমার সীমান্তের সন্ত্রাসী ক্যাম্পগুলো থেকেও অস্ত্র কিনছে ইউপিডিএফ, কেএনএফ ও জেএসএস।
১৯৯৭ সালে কিছু নামমাত্র কিছু অস্ত্র জমা নাটক এবং সেনা ক্যাম্প তুলে নেয়ার ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আসেনি পাহাড়ে। ৫ আগষ্টের পর পাহাড়ে বেশ কিছু ইস্যু সৃষ্টি ও পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা সৃষ্টি করে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন গুলোর মাধ্যমে উক্তেজনা সৃষ্টি করেছে ভারত। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহ শুরু থেকেই ছিল। পরবর্তীতে ভারতের ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন গুলো পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। এদিকে মায়ানমারের আরসা, আরএসও, কেএনএ, আরাকান আর্মির সাথে জান্তা সরকারের সাথে যুদ্ধের ফলে অস্ত্র কেনাবেচা সহজলোভ্য হয়ে উঠেছে পাহাড়ের সীমান্তে।
উপরে উল্লেখিত বিষয় ও ১৯৭০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য যাছাইয়ে প্রমাণিত হয় যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখতে এবং শান্তিচুক্তির পথে বাধাঁ সৃষ্টি করছে ভারত ও মায়ানমার সীমান্তের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কাজ করছে।
