ডেস্ক রিপোর্টঃ
পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন জেলা নিয়ে গঠিত এই পাহাড়ি জনপদ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ, জাতিগত বৈচিত্র্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জন্যও জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অত্যন্ত সু-কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি নেতৃত্বকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক করে ফেলার একটি নীরব কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
খাগড়াছড়ি দিয়ে শুরু করলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়। ধানের শীষের প্রার্থী ওয়াদুদ ভূইয়া যখন জয়ের দিকে দৃঢ়ভাবে এগোচ্ছিলেন, তখনই হঠাৎ করে রাজনৈতিক মাঠে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই দলের আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী সমিরণ দেওয়ানের মনোনয়ন বৈধতা ফিরে পাওয়ার ঘটনা পুরো ভোটের সমীকরণ ওলটপালট করে দেয়। এতদিন যেসব ভোট এককেন্দ্রিকভাবে ওয়াদুদ ভূইয়ার দিকে ঝুঁকছিল, সেগুলো মুহূর্তেই বিভক্ত হয়ে পড়ে। সমিরণ দেওয়ান জেএসএস ও বিভিন্ন উপজাতি রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। এই সমর্থন শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ পাহাড়ি রাজনীতিতে জেএসএসের অবস্থান বরাবরই প্রভাবশালী।
এই পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক ময়দানে আরও এক হেভিওয়েট নাম সামনে আসে এডভোকেট ইয়াকুব আলী চৌধুরী। শুরুতে তাঁর পেছনে ছিল জামায়াতে ইসলামী ও শরিক দলগুলোর সমর্থন। কিন্তু এখানেই ঘটে আরেকটি বড় চমক। হঠাৎ করেই তিনি পাহাড়ি ভোটের একটি অংশের সমর্থন পেতে শুরু করেন। বিপুল জনসমাগম নিয়ে শোডাউন করে তিনি জানান দেন, তিনিও এই আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ফলে বাঙালি ভোট যেমন আরও খণ্ডিত হয়, তেমনি পাহাড়ি ভোটও বিভিন্ন কৌশলে ভাগ হয়ে পড়ে। রাজনীতির এই জটিল খেলায় সাধারণ ভোটাররা ক্রমশ বিভ্রান্ত হয়ে ওঠে।
ভোটের ভাগ যখন প্রায় সমানে সমান, ঠিক তখনই নতুন মাত্রা যোগ করে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমার আবির্ভাব। বিপুল জনসমাগম ঘটিয়ে তিনি প্রকাশ্যে জানান দেন যে এমপি হওয়ার দৌড়ে তিনিও সমানভাবে যোগ্য। ইউপিডিএফের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য সমর্থন পাহাড়ি রাজনীতিতে বরাবরই বড় একটি ফ্যাক্টর। ফলে এই প্রার্থীর মাঠে নামা মানেই ভোটের সমীকরণে বড় ধরনের ধাক্কা। বিশেষ করে বাঙালি প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এটি কার্যত ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করে।
এই প্রেক্ষাপটে যখন রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের দিকে তাকানো হয়, তখন দেখা যায় সেখানে পাহাড়ি প্রার্থীদের বিজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। এর ফলে উপজাতি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টি এখন পুরোপুরি খাগড়াছড়ির দিকে। কৌশল একটাই যে কোনো মূল্যে বাঙালি প্রার্থীদের পরাজিত করা। নারী এমপি নিশ্চিত করার অজুহাতে জেএসএস সরাসরি প্রার্থী দেয়নি, কিন্তু এর আড়ালে যে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে, তা বুঝতে খুব বেশি বিশ্লেষকের প্রয়োজন হয় না। যদি কৌশলে খাগড়াছড়িতে বাঙালি এমপি না হন, তাহলে তিন পার্বত্য জেলার চারটি সংসদীয় আসনই চলে যাবে উপজাতি নেতৃত্বের হাতে। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কার্যত একতরফা নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে এর ফল কী হবে? যখন একটি বড় কমিউনিটিকে পরিকল্পিতভাবে নেতৃত্বশূন্য করা হয়, তখন তার প্রভাব শুধু একটি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসন, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেই কমিউনিটি পিছিয়ে পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা সংখ্যাগতভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও যদি নেতৃত্বের জায়গায় তারা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে নীতি নির্ধারণে তাদের কণ্ঠস্বর ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাবে।
রাঙ্গামাটির চিত্রও খুব আলাদা নয়। এখানে বাঙালি ছাড়াও হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন বেশ কয়েকজন, যার মধ্যে উষাতন তালুকদার অন্যতম। কিন্তু জেএসএস শেষ পর্যন্ত বিএনপির টোপে পড়ে দীপেন দেওয়ানকে সমর্থন দেয়। এই সমর্থনই পাল্টে দেয় পুরো নির্বাচনী দৃশ্যপট। ফলে বাঙালি হেভিওয়েট প্রার্থী এডভোকেট মোক্তার এর বিজয়ের পথ ক্রমশ মলিন হয়ে পড়ে। তিনি যখন মাঠে ভালোভাবে প্রচারণা চালিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছিলেন, তখনই আসে আরেকটি রাজনৈতিক চাপ। ১০ দলীয় জোটের শরিক দল খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবুবকর সাহেবকে সমর্থন দিতে বাধ্য করা হয়। এতে করে বাঙালি ভোট আরও বিভক্ত হয়ে যায় এবং শক্ত লড়াই কার্যত সেখানেই থেমে যায়।
বান্দরবানের ঘটনাপ্রবাহও রাঙ্গামাটির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিল রয়েছে। এখানে এডভোকেট আবুল কালাম ছিলেন একজন শক্তিশালী বাঙালি প্রার্থী। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১০ দলীয় জোটের সমর্থন বিভাজনের ফলে তিনিও পিছিয়ে পড়েন। পাহাড়ি ভোট একদিকে কেন্দ্রীভূত থাকলেও বাঙালি ভোট নানা দলে ভাগ হয়ে যায়। এর ফলাফল হিসেবে বান্দরবানেও বাঙালি নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
এইদিকে অতীতে দলের একনিষ্ঠ কর্মী জাবেদ রেজাকে নমিনেশন না দিয়ে বিএনপিও উপজাতিদের পক্ষ নিতে দ্বিধাবোধ করেনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একটি বাস্তবতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন বাঙালি ভোটে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের ক্ষমতা ও প্রভাব ক্রমশ চলে যাচ্ছে উপজাতীয় নেতৃত্ব ও সংগঠনের হাতে। এই বৈপরীত্য শুধু রাজনৈতিক হিসাবের গরমিল নয়, বরং পাহাড়ি প্রশাসন, নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বাঙালি ভোটার সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনের পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নির্বাচিত এমপি উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা স্থানীয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন। ফলে স্থানীয় সরকার, বাজার ব্যবস্থাপনা, পরিবহন নিয়ন্ত্রণ এমনকি ভূমি ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে উপজাতীয় সংগঠন ও তাদের ছত্রছায়ায় থাকা শক্তিগুলো।
এই ক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র ও আধাসশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতি স্থানীয় মানুষকে ভীত করে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের দুর্বলতা ও আপসকামী মনোভাব এসব গোষ্ঠীকে কার্যত অঘোষিত কর্তৃত্ব দিয়েছে। তৃতীয়ত, নির্বাচিত এমপিদের পাহাড়ে স্থায়ী উপস্থিতির অভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফলাফল হিসেবে বাঙালি জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও বাস্তবে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, অপহরণ কিংবা ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের মতো ঘটনাগুলো পাহাড়ে ‘নিয়মিত বাস্তবতা’তে পরিণত হয়েছে, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্যও অশনিসংকেত।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কেবল এমপি নির্বাচিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃঢ় ভূমিকা এবং পাহাড়ে সমান নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। নইলে বাঙালি ভোটে এমপি হলেও পাহাড়ে উপজাতীয় ক্ষমতার বিস্তার থামানো যাবে না।
এই তিন জেলার ঘটনাপ্রবাহ একত্রে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে সামনে আসে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যেখানে বিভিন্ন দল, জোট ও সংগঠন নিজেদের স্বার্থে বাঙালি নেতৃত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে। কখনো মনোনয়ন বৈধতার নাটক, কখনো জোটগত সমর্থনের হিসাব, কখনো আবার পাহাড়ি ভোটের ‘চমক’ সব মিলিয়ে একটি জটিল কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেরাই অনেক সময় এই কৌশলের শিকার হচ্ছে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে। একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোট ভাগ হয়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পাহাড়ি প্রার্থীদের সুবিধা দিচ্ছে। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সমন্বয়ের অভাব এখানে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই অঞ্চলে যদি বাঙালি নেতৃত্ব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব জাতীয় পর্যায়েও অনুভূত হবে। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা নীতি কিংবা সাংস্কৃতিক ভারসাম্য সব ক্ষেত্রেই একতরফা সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়বে।
এখনো সময় আছে আত্মসমালোচনার। বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি ঐক্যবদ্ধ না হয়, যদি কৌশলগত রাজনীতি বুঝে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অবস্থান আরও সংকুচিত হবে। নেতৃত্ব শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না কেউ না কেউ সেই জায়গা দখল করবেই। প্রশ্ন হলো, সেই নেতৃত্ব কি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ, নাকি একপেশে ও একতরফা?
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের এই রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর। সু-কৌশলে বাঙালি নেতৃত্বকে কোণঠাসা করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা যদি এখনই চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা না হয়, তাহলে আগামী দিনে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বাঙালিদের ভূমিকা কেবল নামমাত্র উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আর সেটিই হবে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি।
